চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক গরু চোরাকারবারির লাশ পদ্মা নদী থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহত ব্যক্তি গত ৩ জানুয়ারি থেকে নিখোঁজ ছিলেন। মঙ্গলবার দুপুরে রাজশাহীর গোদাগাড়ী থানা এলাকা থেকে আনুমানিক ৫০০ গজ দূরে পদ্মা নদীর মিডিল চর নামক স্থান থেকে লাশটি উদ্ধার করা হয়। প্রশাসনিকভাবে উদ্ধারস্থলটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার আলাতুলি ইউনিয়নের আওতাভুক্ত। লাশ উদ্ধারের পর ঘটনাটি ঘিরে হত্যা না নৌকাডুবি, তা নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
নিহতের নাম আহাদ আলী ওরফে গোলকাজুল কাজল (৩৪)। তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের চাকপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবার নাম আলতাফ হোসেন ওরফে ফিরোজ।
প্রত্যক্ষদর্শী, স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের সূত্রে জানা যায়, গত ৩ জানুয়ারি গভীর রাতে আহাদ আলী ওরফে গোলকাজুল এবং কামরুজ্জামান বাচ্চু নামের দুই ব্যক্তি অবৈধভাবে ভারত থেকে গরু চোরাচালানের উদ্দেশ্যে একটি ছোট টিনের ডিঙ্গি নৌকায় করে পদ্মা নদী পার হওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় প্রবল বাতাস ও নদীর তীব্র স্রোতের কবলে পড়ে নৌকাটি ডুবে যায়।
নৌকাডুবির ঘটনায় আহাদ আলী নদীতে ডুবে নিখোঁজ হন। অপরদিকে কামরুজ্জামান বাচ্চু সাঁতার কেটে কোনোভাবে তীরে উঠে প্রাণে রক্ষা পান।
ঘটনার বিষয়ে কামরুজ্জামান বাচ্চু জানান, নৌকাটি ডুবে যাওয়ার পর দুজনই পানিতে তলিয়ে যান। তিনি বলেন, তিনি সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হলেও গোলকাজুল ভারী জ্যাকেট, জিন্স প্যান্টসহ অন্যান্য ভারী পোশাক পরিহিত থাকায় পানির নিচে তলিয়ে যান।
এই ঘটনার পর একটি অপহরণ মামলার সূত্র ধরে পুলিশ কামরুজ্জামান বাচ্চুকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদেও তিনি একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ডুবে নিখোঁজের ঘটনাটি নিয়ে দেশের বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। সে সময় চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ বিভিন্ন গণমাধ্যমে মন্তব্য করে জানান, অবৈধভাবে গরু চোরাচালানের সময় নৌকাডুবির ঘটনায় গোলকাজুল নদীতে ডুবে নিখোঁজ হন।
নিখোঁজ হওয়ার পরদিন নিহতের স্ত্রী মোসা. লিমা বেগম চারজনের নাম উল্লেখ করে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। স্থানীয় সূত্র জানায়, জিডিতে উল্লেখিত ব্যক্তিরা সবাই গোলকাজুলের গরু চোরাচালান সংশ্লিষ্ট পার্টনার ছিলেন।
তবে নিখোঁজের সাত দিন পর পরিস্থিতি হঠাৎ ভিন্ন মোড় নেয়। আগে করা জিডিতে উল্লেখিত চারজনের বাইরে আরও কয়েকজন নিরীহ ব্যক্তিসহ মোট আটজনকে নামীয় এবং আটজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে অপহরণ ও গুমের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মামলার চার থেকে আট নম্বর আসামির সঙ্গে নিহত ব্যক্তির কোনো ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল না। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে নিরীহ মানুষদের মামলায় জড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় প্রাথমিক তদন্ত ছাড়াই মামলা গ্রহণের অভিযোগে জেলার বিভিন্ন মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। রাজনীতিবিদ, সুধী সমাজ ও সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। একাধিক প্রতিবাদ সভা, মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলনে নিরপেক্ষ তদন্ত ও নিরীহ ব্যক্তিদের হয়রানি বন্ধের দাবি জানানো হয়।
জনমত ও ধারাবাহিক প্রতিবাদের প্রেক্ষিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নূরে আলমকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় জেলা পুলিশ।
মঙ্গলবার দুপুরে গোদাগাড়ী থানার পাশের পদ্মা নদীতে আহাদ আলীর লাশ ভাসতে দেখে স্থানীয় লোকজন পুলিশে খবর দেন। পরে নৌ পুলিশ ও থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করে সদর থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে।
নিহতের পরিবার দাবি করেছে, নির্যাতনের পর তাকে হত্যা করে মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। তারা ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
তবে এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এএনএম ওয়াসিম ফিরোজ জানান, মরদেহটি অর্ধগলিত হওয়ায় দৃশ্যমানভাবে আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুলিশের উপস্থিতিতে সুরতহাল শেষে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে বুধবার বিকাল তিনটার দিকে আহাদ আলীর লাশ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
এদিকে স্থানীয় জনগণের একাংশ অভিযোগ করছে, উদ্ধার হওয়া লাশকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তাদের দাবি, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলছে এবং একটি প্রভাবশালী চক্র নিরীহ মানুষদের ফাঁসাতে তৎপর।
স্থানীয় বাসিন্দারা আরও প্রশ্ন তুলেছেন, যদি এটি হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকে, তবে নিহতের পকেট থেকে নগদ অর্থ ও ব্যবহৃত মুঠোফোন কীভাবে উদ্ধার হলো। সাধারণত হত্যার ঘটনায় এসব জিনিস লাশের সঙ্গে থাকে না বলেও তারা মত দেন।
ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পরই ঘটনার প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
